,

‘মনের অলিন্দে আবছায়া মেঘ’ ও আমার জবানবন্দি

মনের ভাবকে বিশেষভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে কখনো কবিতা লিখেছি, কখনো গল্প, কখনো ছড়া লিখেছি। বই করার ইচ্ছা অনেক আগে ছিলো, কিন্তু কী এক অজনা কারণে ইচ্ছেটা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণ হয়ে এক সময় অগস্ত্যযাত্রা করেছিলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এতোদিন পরে এসে আমি বই করছি। জন্মান্তরের সত্যতা-অসত্যতা নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিকরা মাথা ঘামাবেন, তবে তর্কহীন আমি বলতে পারি স্বপ্নান্তর সত্য। অনেক আগে মরে যাওয়া কোনো স্বপ্ন অনেক পরে আবার পুরোনো অবয়বে ফিরে আসে কিংবা জেগে ওঠে স্বপ্নালু মানুষের মানসে। আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, কবিতার বই করার ইচ্ছা আমার ছিলো না। তার কারণ ব্যাপক। তবে একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, বর্তমান যুগটা কবিতার না। এদেশের কোটি কোটি মানুষের অল্প কিছু মানুষ কেবল বইপত্র পড়ে। তার মধ্যে বৃহৎ অংশের ঝোঁক গল্প-উপন্যাসের দিকে। কবিতা বললে নাক ছিটকাতে দেখেছি অনেককে, উপহাস করতেও দেখেছি অনেক কবিতা না বোঝা মানুষকেও। এটা অবশ্য কবিতার দোষ না। তাদের বোধের সমস্যা।
বর্তমানে আমাদের দেশে যে কাজটা সগর্বে চর্চিত হচ্ছে তা হলো অপরাজনীতি। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলেন, মসজিদের ইমাম সাহেব রাখা না রাখা বলেন, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সংসদ-অবধি আমার দুর্দান্তভাবে অপরাজনীতির ভিতরে নিমজ্জিত।

খারাপকে খারাপ বলা, ভালোকে ভালো বলার সাহসটুকু আমরা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছি। অতিআধুনিক মানুষের অন্যতম স্পষ্ট দিক হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত স্বার্থান্ধতা। নিজের আখের গোঁছাতে আমরা কোনোভাবেই আর দেখছি না, কোনটা শুদ্ধ কোনটা অশুদ্ধ। নিজের ষোলকলা পূর্ণ করতে না পারলে আমরা আশ্রয় নিচ্ছি রাজনীতির। কারো অনৈতিক ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে যখনই রাজনীতি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে শুরু করে তখন রাজনীতির আগে অপ উপসর্গ যোগ হয়ে যায়। অপরাজনীতি। যারফলে শিল্পসাহিত্যের যে নান্দনিক আবেদন, নিবেদন কিংবা বার্তা তা জনতার বোধে, মানুষের সমাজে, আমাদের যাপিত জীবনে তেমন প্রভাব রাখতে পারছে না। সেই আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে আমার মূলত কবিতার বই করার ইচ্ছেটা মরে যায়।

বোধ বিসর্জনের এমন মহোৎসবে শিল্পসাহিত্যও আর বাকি থাকতে পারছে না। তবু যারা কবিতা দিয়ে, ছড়া দিয়ে, গল্প-উপন্যাস দিয়ে জাতির বোধ-বিবেককে নাড়া দেবার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে তারা নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাওয়ার উপযুক্ত।
কিন্তু তবু আমি কবিতার বই করছি। কেবল কিছু মানুষের তাড়না থেকে শুধু নয়, আমার কবিতার বই করার পিছনে এটাও সত্য যে, কবিদের কাজ নাকি জাতিকে স্বপ্ন দেখানো। ‘মনের অলিন্দে আবছায়া মেঘ’ –এ যে কবিতাগুলো রেখেছি তার একটা কবিতায় কেবল একটা স্বপ্ন জাতিকে দেখাতে চেয়েছি সেটা হচ্ছে ঐক্যবদ্ধতা। বর্তমানে আমাদের জনগোষ্ঠী গঙ্গাপদ্মার মতো সমান দুভাগে বিভক্ত। এক গোষ্ঠীকে বলাে হচ্ছে রাজাকার আরেক গোষ্ঠী নিজেকে দাবি করে চলছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের। এই দ্বিপাক্ষিকতা আমাদের এখানে কী পরিমান দুর্যোগের, দুরাবস্থার সৃষ্টি করে চলছে তা দিনের আলোর ন্যায় স্পষ্ট।

“এসো ব্যবধান গুছিয়ে আমরা চোখে চোখ রাখি/ মলিন কার্নিসে ফুটিয়ে তুলি গৌরবের আলপনা/ আমাদের মিলনে ম্লান হবে ক্লেদাক্ত ইতিহাস/ রূপালি জলের ধারায় আত্মাহুতি দিবে অযাচিত অশুচিতা/ দুধেভাতে উদর ভরিয়ে জমাবো পাখির কোলাহল”

বাকি কবিতাগুলোতে ব্যঙ্গ, বিদ্রোহ এবং বিরহের কাতরতা রাখতে চেষ্টা করেছি।

শেষকথা হচ্ছে–আমি কবিতা হিসেবে এসব লিখেছি। কারো কাছে এসব ফালতু মনে হতে পারে, কবিতা মনে নাও হতে পারে। মনে হতে পারে টাইম লস, মনে হতে পারে পাগলামী অথবা মনে হতে পারে অন্য কিছু। সেটা হতেই পারে। আবার কারো কারো কাছে হতে পারে অনেক আদরের। কারো কাছে একটা লাইনও যদি কবিতা মনে হয় সে আমার সার্থকতা ধরে নিয়ে সান্ত্বনা বোধ করবো। নয়তো আপনার লসের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী এবং নিজের লসের জন্য অনুতপ্ত হবো। তবে নির্দ্বিধায় এ কথা বলতে পারি–

“কবিতা জাতির নান্দনিক বোধের বহিঃপ্রকাশ। শৈল্পিক মনোভাবের স্বাক্ষর। কবিতা জাতির গৌরব এবং আভিজাত্যের ঝলমলে ইতিহাস।
কবিতা সুন্দরের কথা বলে। বোধনের কথা বলে। শক্তি, সাহস, সম্ভাবনার কথা বলে।
কবিতা সত্যের জন্য, সমতার জন্য, একতার জন্য।
আসুন আমরা সকলে দ্বিধা-দ্বন্ধ ভুলে কবিতা পান করি।
কবিতা নিষিদ্ধ কিছু নয়।
বরঞ্চ হৃদয়ের জন্য বিশেষ উপকারী!”

৩০, ০১, ২০১৯
আলমগীর মুহাম্মদ সিরাজ
চট্টগ্রাম।

মতামত