,

অসহায়দের সহায়- ‘পে ইট ফরওয়ার্ড’

‘পে ইট ফরওয়ার্ড’ হলো ফেসবুকভিত্তিক একটি সংগঠন। যে সংগঠনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ২০১৬ সালের জুন মাসে। গত দুই বছরে এর কল্যাণে বৃত্তি পেয়ে পড়ালেখা চালাচ্ছেন সারাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের পাঁচশ’রও বেশি শিক্ষার্থী। এছাড়াও আরও নানা সেবামূলক কাজ করছে সংগঠনটি।
‘পে ইট ফরওয়ার্ড’-এই তিন শব্দকে বাংলায় বলা যায় ‘এগিয়ে দিতে’। এখান থেকে যারা সহায়তা নিচ্ছেন, তাঁরা যখন প্রতিষ্ঠিত হবেন, তখন একইভাবে তাঁরাও আরেকজনের পাশে দাঁড়াবেন- এটুকুই আমরা প্রত্যাশা করি। এটাই আমার স্বপ্ন।
বুধবার পূর্বকোণ স্টুডিওতে পরিবর্তনের কারিগর অনুষ্ঠানে এসে পে ইট ফরওয়ার্ড-এর মূল উদ্যোক্তা চট্টগ্রাম কর বিভাগের কমিশনার সৈয়দ মোহাম্মদ আবু দাউদ (বাদল সৈয়দ নামেই যিনি সমধিক পরিচিত) এভাবেই সংগঠনের পরিচয় তুলে ধরেন। বলেন, সংগঠন নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা।
তার সঙ্গে এ সময় স্টুডিওতে ছিলেন, সংগঠক সায়মা আক্তার, কৃতী শিক্ষার্থী উম্মে সুমাইয়া তোহফা ও আবু বকর। পে ইট ফরওয়ার্ড এর সঙ্গে আলোচনার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রশ্নোত্তর আকারে নিচে প্রদত্ত হলো।
পূর্বকোণ : পে ইট ফরওয়ার্ড-এর কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন।
বাদল সৈয়দ : এটা আমাদের মাথায় আসে ১৯৯৩ সালের দিকে। যখন আমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করে এই সার্ভিসে যোগ দিবো। তখন আমার একজন শিক্ষক বলেছিলেন- ‘এই যে তুই স্কুল কলেজে পড়াশুনা করেছিস, নামমাত্র বেতনে। বাকি টাকা কিন্তু সরকার দিয়েছে। একজন দরিদ্র রিকশাওয়ালা থেকে কিংবা একজন গার্মেন্টস কর্মী থেকে সরকার এই টাকা পাচ্ছে’। এই মানুষগুলোর কাছে আমাদের ঋণ আছে, এই ঋণ কিভাবে শোধ করা যায় সেই চিন্তা থেকে মূলত প্রথমে ১৯৯৬ সালে আমরা গড়ে তুলি ‘পে ব্যাক সোসাইটি’ নামের একটি সংগঠন। এর কাজ ছিল ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে খুঁজে বৃত্তি দিয়ে পুনরায় স্কুলে ফিরিয়ে আনা। নীরবে এ কাজ চলেছে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। ওই বছরই আমার এক প্রবাসী বন্ধু জানালেন, বিশ্বব্যাপী পে ইট ফরওয়ার্ড নামে একটি আন্দোলন আছে। সে সম্পর্কে জেনে পুরোনো সংগঠনের নাম বদল করে পে ইট ফরওয়ার্ড রাখলাম। একই বছরের জুনে ফেসবুকে পে ইট ফরওয়ার্ড নামে পেজ খুলি। আমার সঙ্গে যোগ দেন ইকবাল তানজির ও সায়মা আক্তার নামের দুই তরুণ। তাঁরা তিনজন মিলে এখন ফেসবুক পেজটি পরিচালনা করছেন। এই পেজের সদস্যসংখ্যা এখন প্রায় ২০ হাজার।
পূর্বকোণ : এই নাম পরিবর্তন করলেন, এর আর কোন কারণ কি আছে?
বাদল সৈয়দ : নামটা পরিবর্তন করার কারণ হচ্ছে, আমাদের একটি শর্ত আছে। শর্তটা হচ্ছে আমাদের কাছ থেকে যারা সাহায্য পায় তাদের আমরা বলি, তোমাদেরকেও এ সাহায্য এক সময ফিরিয়ে দিতে হবে। ফিরিয়ে দেওয়া মানে আমাদেরকে নয়। সে যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন অন্যকোনো অসহায় মানুষকে তার সাহায্য করতে হবে। এটাই আমাদের শর্ত। আমাদের যারা আর্থিকভাবে সহয়তা করেন, তারা ২০১৬ সালর জুন থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেড় কোটি টাকা ব্যয় করেছেন শিক্ষার্থীদের জন্য এবং অন্যান্য মানবিক কাজের জন্য। কিন্তু আমরা কোনো দান এবং অনুদান সরাসরি গ্রহণ করি না। আমরা দেশ এবং বিদেশের প্রচুর অনুদান ফিরিয়ে নিয়েছি। যারা সাহায্য চায় আমরা চেষ্টা করি তাদেরকে দাতার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া। আমরা সরাসরি কোন টাকা গ্রহণ করি না।
পূর্বকোণ : সহযোগিতা করার প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে যদি একটু বিস্তারিত বলেন-
বাদল সৈয়দ : অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছেন কিংবা পরিবারকে দেখাশোনা করতে কারও চাকরির প্রয়োজন- এমন কোনো সমস্যায় পড়লে ভুক্তভোগী বা সদস্যদের কেউ তা পে ইট ফরওয়ার্ড-এর পেজে তুলে ধরেন। পরে সংগঠন পরিচালনাকারী (এডমিন) তা যাচাই-বাছাই করেন। সব ঠিক থাকলে তাঁরা দাতাদের আহ্বান জানান সহযোগিতার জন্য। দাতাদের কেউ কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসেন। তবে কারও নজরে না এলে এক্ষেত্রে এডমিনরা নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারপর দাতাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগসূত্র তৈরি করে দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত আসা আবেদনের ৯৫ শতাংশই আমরা সমাধান করতে পেরেছি। যে ৫ শতাংশের সমাধান করতে পারিনি সেটার জন্য আবেদনকারীর আবেদনে সমস্যা থাকার কারণে সম্ভব হয়নি। কিংবা আবেদনের বিশ^াসযোগ্যতা ছিল না।
পূর্বকোণ : পে ইট ফরওয়ার্ড-এর সহায়তায় আপনি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কীভাবে এ সংগঠনের সাথে যোগাযোগ হল?
আবু বকর সিদ্দিক : আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে অর্নাস তৃতীয় বর্ষে পড়ছি। আমার পরিবারের কিছু খরচও তখন আমাকে বহন করতে হতো। সেই সাথে আমার পড়ালেখার খরচও। আমার দুটো টিউশনি ছিল, একটি দিয়ে পরিবারের খরচ হয়ে যেত, আরেকটির টাকা দিয়ে পড়াশুনার খরচ হয়ে যেত। কিন্তু মাঝপথে আমার একটা টিউশন চলে গেল। তখন আমার পড়াশুনা করাটা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এরপর আমার এক বন্ধু জানাল- আমার একটি জানা সংগঠন আছে, এরা দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিয়ে থাকে। তুমি যদি চাও আমি তোমার হয়ে চেষ্টা করতে পারি। এরপর আমি তাকে বলি- তাহলে একটু চেষ্টা করো। আমার বন্ধুটি আমার সার্টিফিকেটগুলো স্ক্যান করে ওদের পেজে দিলো। ওনারা এটা দেখে আমাকে বৃত্তি দিয়েছেন। এখনও আমি বৃত্তি পাচ্ছি এ সংগঠন থেকে।
পূর্বকোণ : আপনি পে ইট ফরওয়ার্ড থেকে সহায়তা নিয়ে চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করছেন। আপনি কীভাবে পে ইট ফরওয়ার্ড-কে খুঁজে পেলেন?
উম্মে সুমাইয়া তোহফা : আমার সকল খরচ বহন করেন আমার আম্মু। আর পে ইট ফরওর্য়াডের বাদল সৈয়দ আংকেলের সাথে আম্মুর পরিচয় ছিল। তখন আংকেল আমাদের সম্পর্কে জানতেন। তিনি আম্মুকে সংগঠনের কথা বলেন এবং আমাকে স্কলারশিপ দিয়ে পড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেন। এটা আমি এমবিবিএস প্রথম বর্ষ থেকে পাচ্ছি। এখনও এই বৃত্তি চলমান আছে।
পূর্বকোণ : আচ্ছা, বৃত্তির ক্ষেত্রে একটা শর্তের কথা বলা হয়েছে, এই শর্তটি কি এবং কীভাবে আপনারা শর্তটি পূরণ করেন?
উম্মে সুমাইয়া : আমাদেরকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে একটা ভালো কাজের রিপোর্ট দিতে হয়। প্রতিদিন একটি ভাল কাজ করে সেটি জানাতে হয় ওই সময়ের মধ্যে। এভাবে ভাল কাজের চর্চার মাধ্যমে আমাদের মনোবল আরো সুন্দর হয়। এটা আমাদের ভালো কাজের জন্য প্রেরণা বলতে পারেন।
বাদল সৈয়দ : এ বিষয়ে আমি একটু বলি, আমাদের শর্ত হচ্ছে যাদের পাশে আমরা দাঁড়াচ্ছি, তাদেরকেও এরকম অন্যদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবে এটা কোনো কাগজে-কলমে নয়। এটা শুধুমাত্র বিশ্বাসের মাধ্যমে। এরমধ্যে হয়তো অনেকে এই বিশ্বাসটা নাও রাখতে পারেন। তবে আমরা তাদের প্রতিদিনের একটা ভালো কাজের রিপোর্ট দিতে বলি। এটা ফেসবুকে আমাদের পেজে দিবে। এর মধ্যে আমরা সেরা তিনটি ভালোকাজ সিলেক্ট করি। এদের পুরস্কার দিই। তবে পুরস্কারটি তারা পায় না। যারা বিজয়ী তাদের সম্মানে কোনো অসহায় মানুষকে পুরস্কারস্বরূপ সাহায্য করা হয়।
পূর্বকোণ : সংগঠনে আপনার কাজগুলো কি কি?
সায়মা আক্তার : এখানে আমি এডমিন হিসেবে কাজ করছি। যারা আমাদের ফেসবুকে মেম্বার হতে চান তাদের যাচাই করে এড করি। আমাদের পেজে যারা সাহায্যের আবেদন করেন তাদের যাচাই করার পর আমরা ওদের জন্য পোস্ট করে থাকি। এরপর আমাদের ডোনাররা আসেন এবং সাহায্য করেন।
পূর্বকোণ : আপনি যে ‘পে ইট ফরওয়ার্ড’র সহায়তায় কারো দেয়া সাহায্যে পড়াশুনা করছেন, এটা নিয়ে পত্রিকায়ও একটা প্রতিবেদন হয়েছে- এতে কি আপনার মধ্যে কোন সংকোচবোধ কাজ করে? বা কোন হীনমন্যতায় ভোগেন?
আবু বকর সিদ্দিক : পত্রিকায় আমাকে নিয়ে যা লিখা হয়েছে, তার কোনো একটি অক্ষরও ভুল নেই। আর এতে কোনো লজ্জারও কিছু নেই। আমি মনে করি আংকেল আমাদের ভেতর ভালো কাজের যে বীজ বুনে দিয়েছেন, এটা একদিন অনেক বড় গাছ হয়ে আরও অনেক মানুষকে ছায়া দিবে।
পূর্বকোণ : এ-পর্যন্ত আপনাদের কাছ থেকে কতজন বৃত্তি পেয়েছে?
বাদল সৈয়দ : বর্তমানে ৫০০ জন পাচ্ছে। এর আগে কমপক্ষে আরো ৩০০ জন আমাদের কাছ থেকে বৃত্তি পেয়েছে।
পূর্বকোণ : অনেকে অনলাইনে অভ্যস্ত নন। এমনকি এই ধরণের একটি গ্রুপের কথা হয়তো জানেনও না। সাহায্যপ্রার্থী এমন অনেকে হয়তো এজন্যে পড়াশুনা থেকে ঝরে পড়ছে। তাদের জন্য কি আপনাদের কোনো কার্যক্রম আছে?
বাদল সৈয়দ : সাহায্যপ্রার্থী শিক্ষার্থীদের নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত নিউজ পড়ে পড়ে আমরা অনেক শিক্ষার্থীদের নিজ উদ্যোগে খোঁজ খবর নিয়ে মেডিক্যাল, বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। এরকম হাজার হাজার শিক্ষার্থী হবে। কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় আমাদের খুবই ব্যস্ত সময় যায় এসব কারণে। এছাড়াও আমাদের আরো নানা সামাজিক কাজ রয়েছে।
পূর্বকোণ : আপনাদের কি পরিমাণ ডোনার রয়েছেন?
বাদল সৈয়দ : আমরা কোনো ক্যাশ টাকা নিই না। আমাদের ডোনাররা সরাসরি নিজ হাতে যারা আবেদন করে সাহায্যের জন্য তাদের হাতে দিয়ে দেয়।
পূর্বকোণ : আপনি যদি সামর্থ্যবান হন কি করবেন?
উম্মে সুমাইয়া : আমিও পে ইট ফরওয়ার্ডের একজন ডোনার হতে চাই।
পূর্বকোণ : আপনি কি করবেন যদি সামর্থ্যবান হন?
আবু বকর সিদ্দিক : আমি চেষ্টা করবো বাংলাদেশে মানসম্মত আইনের বইয়ের ব্যবস্থা করতে। কারণ আমরা যারা পড়াশুনা করি, আমাদের আইন বিষয়ক অনেক বই আছে, যেগুলো বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। আমি এই সমস্যাটা দূর করার জন্য কাজ করতে চাই।
পূর্বকোণ : পে ইট ফরওর্য়াড নিয়ে কোনো স্বপ্ন থাকলে বলুন।
বাদল সৈয়দ : আমার প্রথম স্বপ্ন হচ্ছে ‘পে ইট ফরওয়ার্ড’ টিকে থাকুক। আমি চাই সবাই ‘পে ইট ফরওয়ার্ড’কে মনে রাখুক আর বাদল সৈয়দকে যেনো ভুলে যায়। আরেকটি কথা, সেটা হলো- শুধুমাত্র টাকার অভাবে যেনো কেউ পড়াশোনা থেকে ছিটকে না পড়ে আমি সেই বিষয়টি দেখতে- শুনতে চাই না। পে ইট ফরওয়ার্ড একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সাহায্য করে যেতে চায়। সেটা যদি পিএইচডি, এমফিল কিংবা বিদেশে কোন ডিগ্রি নেয়াও হয়ে থাকে।
যোগাযোগ : পে ইট ফরওয়ার্ড, বাংলাদেশ
প্রযতেœ : মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, বাড়ি-৯৮, রোড-১৮, সেক্টর-১১, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ ফোন: ০১৮৪৭১০১৪৪২

#সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন সাইফুল আলম ও সরোয়ার আহমদ

মতামত