,

শাম্মী তুলতুলের গল্প || চারহাতের ভালোবাসা

চারহাতের ভালোবাসা
শাম্মী তুলতুল

তিলতিল মরে যাওয়া মানুষটি একটা সময় হাঁফ ছেঁড়ে বাচতে চায়। চায় স্বাধীন হতে অন্যের অধীন থেকে।কিন্তু নাহ পারে না। পারে না তার দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে। পারে না তার নিজের বিবেক থেকে নিজেকে আড়াল করতে। একটা সময় আবার সেই জায়গাটিতেই সে ফিরে আসে। ময়না যখন তার পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে মলম লাগিয়ে ভাবনার জগত থেকে একবার বের হয় আবার ঢুকে তখন দরজায় কেউ কড়া নাড়ে।
কে?
মাড্যাম আমি।
ময়না শাড়ির আঁচল বুকে ঝাঁপিয়ে দরজা খুলে।
আপনি?
দেখতে এলাম অনেকদিন হয়ে গেলো অফিসে যান না তাই।
ময়নার চোখে মুখে বিরক্তি লোকটিকে দেখে। কি বলতে এসেছেন তাই বলুন।
বসতে দিবেন না?
সমস্যা আছে ।
এমন স্বামী ছেড়ে দিলে কি হয়?
কথাটা শুনে ময়না চোখ বড় বড় করে তাকায় কিন্তু রাগ সামাল দিয়ে বলে, কোন ক্ষতি করেছে কি আপনার?
চেহেরা ছাড়া আর কিছুই নেই।
আমি এতেই খুশী। আসল কথা বলুন।
স্যার ডেকেছেন। আপনাকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না।
সময় হলে আসবো আমি।
ঠিক আছে। তাই বলে দিবো। গেলাম।
ময়না কদিন ধরে অফিসে যাচ্ছেনা। তার ইচ্ছেই করছে না আর। ফোন বন্ধ। খুললেই রাকিবের ফোন কখন বেজে ওঠে তাতেই অস্থির ময়না। কিন্তু হুট করে তো আর পার পাওয়া যাবেনা তাই নিজেই ফোনটা দেওয়া দরকার মনে করলো। না হয় আবার তার সেক্রেটারি হাজীর হবে। ফোন খুলতেই দেরী নেই বেজে উঠল।রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে কিগো এখন কি আর মন চায়না?
দেখো অনেক হয়েছে আমি আর পারবোনা। আমার টাকাগুলা দাও।
আদর না দিলে তো হবে না।
আমার দ্বারা আর সম্ভব না।
ওকে আমার দ্বারাও আর সম্ভব না। ফোনটা কেটে দিলো রাকিব।
ময়নার চোখ ছলছল করে উঠল। ভুলের মাসুলতো দিতে হবে। কিন্তু এটাতো ভুল নয়। জেনে শুনে ভুল করেছি আমি। আমিও সেদিন আবেগী হয়ে গিয়েছিলাম। রাকিবের সাথে প্রায় সব ভাগ করেছিলেন আমার ভালোবাসার মানুষটিকে ঠকিয়ে। কিন্তু আমি কখনো রাকিবকে ভালবাসিনি তবে শ্রদ্ধা ছিল খুব তার প্রতি। প্রচুর ভালোবাসতো সে আমাকে এই বিশ্বাসের ওপর তার সাথে এতদূর এগিয়েছিলাম। কিন্তু একটা সময় যে হিপোক্রেট হয়ে বের হবে তা ভাবিনি। তার কাছে সাহায্য চাইতাম সব সময় আজ সে সুযোগ প্রতিনিয়ত নিয়েই ছাড়ছে। স্বামীর পঙ্গুত্বকে সে দুর্বলতা পেয়েছে। গুণাক্ষরেও ভাবিনি এভাবে ব্ল্যাকমেইল করবে।
কিন্তু টাকা খুব দরকার কই পাবো টাকা? কার কাছে যাবো হাত পাততে। তার মাসের বাড়তি টাকাটা আমার কাছে নেয়ামত মনে হয়। এই মাসে আর টাকা পাব না। উহ! ময়নার আর মাথা ধরে না। ভাবতে ভাবতে তার স্বামী ফিরে এলো । ময়নার স্বামী আপ্রাণ চেষ্টায় একটা কাপড়ের দোকানের ম্যানেজার হিসেবে চাকরী পেলো ।ব্যাংকে চাকরি করতো তার স্বামী কিন্তু স্বামীর এক্সিডেন্ট দুজনের জীবনটা এলোমেলো করে দিলো।আর সেই খারাপ মুহূর্তে ময়না চাকরী নিল একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে। সেখানেই রাকিবের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ময়না বড়লোক বাবার মেয়ে।ভালোবেসে বিয়ে করে আতিককে। আতিককে সে মনে প্রাণে ভালোবাসে। আতিকও তেমন। সমাজে নিজের স্ট্যাটাস ধরে রাখতে তারা কেউ কোথাও ছোটো হতে পারছেনা। এমন কেউ নেই যে যাদের কাছে গিয়ে শান্তনার বানী শুনবে। ময়না ভেতরে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে এই পুড়ে যাওয়ার কেউ দেখছে না। দেখাতেও পারছে না। আভিজাত্যে বড় হওয়া ময়না আজ নিঃস্ব।
যে যার অবস্থানে থেকে চেষ্টা করছে সংসার চালিয়ে নেওয়ার।
ময়নার মুখ আধার দেখে আতিক বলে, কি হলো মুখ কালো কেন তোমার?
ময়না আতিকের উত্তর না দিয়ে বলল, দুধ চিনি চা পাতা এনেছ?
সেদিন না আনলাম।
প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তোমার মা চা বেশী খায়। আমিও কম না।
এমন হলে কিভাবে চলবে?
আস্তে বল শুনবে।
শুনলে শুনুক আমি আর পারিনা। এসব বলে লাভ নেই? এক সময় ছিল আমাদের ভাবে এখনও আছে।
উল্টো হয়ে গেলো তাই না ?
কেমন?
এই যে কোথায় তুমি প্যাঁচ করবে তা না তুমি আমাকে শান্তনা দিয়ে সব পানি করে দাও।
তোমাকে ক্ষেপিয়ে দিলে পরে বলবে আমি শাশুড়িকে আদর করিনা।
তা জানি না। তবে তুমি অনেক কষ্ট করছ আমার পরিবারের জন্য। আমি কিছুই করতে পারছি না।
এমন করে বলনা প্লীজ।
তোমাকে চাকরি করতে হবে এটা আমি কখনো ভাবিনি।
এসব কথা থাক। আমি এতো পড়াশোনা করলাম তোমার হাত ধরে। কম কষ্ট তো করনি তুমি। এখন যদি এই বিদ্যা কাজে না লাগে আর কবে লাগবে? তুমি ফ্রেস হও আমি চা বানাতে গেলাম।
রান্না ঘরে যেতে যেতে ময়না শাশুড়িকেও জিজ্ঞেস করলো, আপনি চা খাবেন আম্মা?
দাও খাবো।
খুব বিরক্ত লাগছে তার চা বানাতে। আধা ঘণ্টা আগে শাশুড়ির জন্য চা বানিয়ে নিজেও খেলো। এখন স্বামীর জন্য বানাতে গিয়ে আবার তিনজনের জন্য সমান চা বানাত হবে। ঘরে পানি থাকে না। রাতের জমিয়ে রাখা পানি দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলতে হয়। চারটি মাত্র রুম। খুব পুরানো বাড়িটি জড়া- জীর্ণ। মাথার ওপর ছাদের ইট মাঝে মধ্যে খসে পড়ে। একদিন ময়নার মুখ বরাবর পরেছিল যে প্রান্তে সে শোয়। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলো। নইলে ঠিকই চোখ যেতো। ঘরে লোকসংখ্যা চারজন। কাজের মেয়ে ছিল এখন নেই।ময়না নিজ হাতে সব কাজ করে। মাঝে মধ্যে শাশুড়িও সহযোগিতা করে। কিন্তু ময়নার তা পছন্দ নয়। শাশুড়ির কাজ করলে তার লজ্জা লাগে। হাজার শরীর ঝিমুলেও শাশুড়ি ডাকলে জী আম্মা বলে সাড়া দেবেই।
চা পর্ব শেষ করে ডাইনিং টেবিলটা পরিস্কার করে হাতটা ধুয়ে মুছতে মুছতে নিজের রুমে চলে আসে ময়না। স্বামীর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে সে। এটি তার নিত্য দিনের কাজ। এরপর স্বামী চলে যাবে আবার দোকানে। ফিরবে সেই এগারটায়। স্বামীর পাশে এক গাল হাসি নিয়ে বসল ময়না।
খুব ক্লান্ত তাই না? করতে তো হয়।
হাত পা ছেড়ে একটু শুইয়ে থাকো।
না এখন থাক। আবার উঠতে কষ্ট হয়ে যাবে।
একজন- আরেকজনের হাত ধরে দুজনে গল্প করছিল তারা। জীবন নামের গাড়িটি নিয়ে রোজ তাদের কথা হয় কিন্তু সমাধান মিলে না। এক সময় গল্প করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসা থেকে উঠে যেতে হয় দুজনকে দুদিকে। এভাবেই চলছে তাদের জীবনের গাড়ি। এক ঘেয়েমি জীবন। একই রাত একই দিন। ঘুমানোর আগ মুহূর্তে প্রায় রাতে রাকিবের এস এম এস আসে ময়নার ফোনে।
কি আদর দিবেনা?
এই শব্দটা শুনতেই ময়নার ঘেন্না হয়। ইচ্ছে করে খুন করে গলা টিপে তাকে। একবার ভাবল এস এম এস এর রিপ্লাই দিবে না। আবার দিয়ে বলে, আমার পাওনা টাকাগুলো দিয়ে দাও।
ওটা হবে না এক চুলও না।
তোমার দুটো বাচ্চা আছে এদের দোহায় লাগে এদের দিকে একবার তাকাও তোমার মেয়ের কথা একবার ভাবো।
এসব বলে কোন লাভ নাই। আমাকে সব দিলে হবে নয়তো এক পাইও না। ময়নার হাত পা কাঁপে। প্রতিটি রাত তার খুব কষ্টে ভয়ে আর আতঙ্কে কাটে। রাকিব এখন সমস্ত শরীরে কবজা করতে চায়। এতো হিংস্র হতে কি করে পারে?
আতিকের ঘুমন্ত চেহেরাটা দেখে ময়না হু হু করে কেঁদে উঠে। মুখ চেপে ধরে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ে। ময়নার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পারা যাবে না। পারা যাবেনা সমাজের ভয়ে, সমাজের মানুষের ভয়ে। আত্মসন্মানের ভয়ে। নারীর কি শারীরিক গঠন নিয়ে জন্মানো পাপ? নারী দেখলেই পুরুষ এতো লোভাতুর হয় কেন। আচ্ছা সৃষ্টিকর্তা তুমি তো চাইলেই নারীকে অন্যভাবে বানাতে পারতে। তাদের এতো আকর্ষণীয় নাও করতে পারতে। তুমি কি পারতে না তাদের কোন না কোন অংশ অলোভনীয় করে বানাতে।নিজেকে নিজে ধিক্কার দেয় ময়না। জানি এসবের উত্তর আমি কখনো পাবোনা। নিজেকে নিজের মধ্যে দাবিয়ে রেখে নিজের ভেতরটা কুরে কুরে মেড়ে ফেলতে হবে।এভাবে প্রতি রাত নিজের সাথে নিজে কথা বলতে বলতে ময়নার কোন ফাঁকে চোখের পাতা এক হয় বলতে পারে না সে। পরদিন সকাল সকাল ময়নাকে তৈরি হতে দেখে আতিক জিজ্ঞেস করলো কোথায় যাচ্ছ?
অফিসে।
আর কাজে যাওয়ার দরকার নেই কোন রকম হয়ে যাবে। আমি চেষ্টা করছি।
তা না কিছু কাজ বাকি আছে।
জলদি এসো তাহলে। আতিক ময়নাকে খুব বুঝতে পারে। এও বুঝতে পারে কোন একটা অপরাধে সে জ্বলছে। কিন্তু তবুও সে ময়নাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে না। আতিক বুঝে নারী স্ব -ইচ্ছায় অনেক কাজ করে না।তাকে বাধ্য করায়। তাই ময়নাকে সে ক্ষমাও করে দিয়েছে।
ময়না রিকশায় উঠে সোজা রাকিবের ফ্ল্যাটে চলে গেলো। রাকিব দরজা খুলল। রাকিব মদের গ্লাস রেখে ময়নার থুতনি ধরে বলল, কি গো রুপের বড়াই কি কমলো নাকি? আমি কনোদিন কল্পনা করিনি তুমি একজন ব্ল্যাকমেইলার হবে। আমাকে সেক্সুয়াল টর্চার করবে।
এটা আমার ভালোবাসা।
আমাকে মানসিক অশান্তিতে রেখে এটা কি ধরণের ভালোবাসা? আমার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া একে কি ভালোবাসা বলে?
দেখো এতো যুক্তি বুঝি না। আদর দিলে সব হবে আর এবার আমার সব চাই। আর না হলে কিছুই হবেনা।
জোর করে কিছু হয়না।
বলতে পারো। কিন্তু আমার কাছে এটাই আদর।
ময়না বুঝল এই অমানুষকে বুঝিয়ে কোন লাভ নেই।শুধু শুধু সময় পার। বসা থেকে উঠে গিয়ে ময়না বলল, বাঘের বল বার বছর জানতো, আজ গায়ে বল আছে তাই প্রয়োগ করছ। এই বল বেশীদিন থাকবে না।
এসব নীতি বাক্য আমাকে শুনিয়ে কাম নাই। রাজী হলে সব হবে। আর নয়তো কিছুই হবে না। ময়নার টপটপ চোখের পানি এই পিশাচকে এক চুলও নাড়াতে পারলনা। ময়না রাখিবের ফ্ল্যাট থেকে বেড়িয়ে এলো। ময়না হাঁটা দিলো ডান -বাম না তাকিয়ে গন্তব্য শুধু বাড়ি। বাড়িতে এসে দেখে আতিক ঘরে আছে।
আতিককে দেখে সে কেঁদে ফেলল। আতিকের কোলে মাথা রেখে বলে, আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না।আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছে।
আতিক বলল, আমরা হার কেন মানছি বল? হার মানা মানেই ওদের কে জিতানো। ওরা তাই চায় ওরা চায় নারী হেরে গিয়ে এই পৃথিবী ছেঁড়ে চলে যাক। আর তারা তাদের হাসিকে বাহবা দিবে অন্য নারীকে ধ্বংস করতে। তাই ঘুরে দাঁড়ানোই হবে আমাদের জয়। আলো আসবেই ময়না। দুঃখ যদি না থাকে আনন্দের উৎস কোথায়? দুঃখ একদিন বিদায় হবেই।
ময়না স্বামীর কথায় সাহসের নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল আসলেই কেন আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিবো।ওদের শান্তি দেওয়ার কোন মানে হয়না। ওদের মুখোশ উন্মোচন করে ওদেরকেই বাধ্য করতে হবে নির্লজ্জ জীবনটাকে ধ্বংস করতে। ময়না চোখ মুছে নতুন করে জীবন এগিয়ে নেওয়ার আশায় একটি তৃপ্তির ঢেকুর তুলল।

লেখক: গল্পকার

মতামত