,

বইমেলায় ফাহমিদা বারীর গল্পগ্রন্থ ‘রোদ্দুর খুঁজে ফিরি’

সাল সাবিলা নকি: কনকনে শীতের কুয়াশা যখন চারপাশে জেঁকে বসে, যেদিকে তাকাই শুধু চোখে ঘোর লাগা ধোঁয়াশা দেখা যায় তখন মন-প্রাণ দিয়ে প্রতিটি মানুষ চায়, আজ একটু রোদের দেখা মেলুক। তাপ বিবর্জিত স্যাঁতস্যাঁতে এক টুকরো মাটিও তখন এক চিলতে রোদের প্রত্যাশা করে। অন্ধকার ঘরের কোণটিও যেন ফিসফিস করে বলে, ‘জানালা খুলে দাও, আলো আসুক’। ফাহমিদা বারীর ‘রোদ্দুর খুঁজে ফিরি’ গল্পগ্রন্থটির গল্পগুলো আড়ালের গল্প। যে গল্পগুলো সত্য মিথ্যার দোলাচলে দুলতে দুলতে একসময় হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু এগুলো আমাদের সমাজের কিছু অমোঘ সত্যের প্রতিনিধিত্ব করে। লেখিকা চেয়েছেন, আড়ালে পড়ে থাকা গল্পগুলোকে সামনে আনতে। তাঁর ভাষায়, ‘রোদ্দুর খুঁজে ফিরি দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই অন্যপ্রান্তের গল্পগুলোকে নিয়েই। কিছুটা আলো ফেলতে চেয়েছি তাদের ওপর। সবটুকু পেরেছি কি? বিচারের ভার পাঠকের ওপর।’ একজন ক্ষুদ্র পাঠক হিসেবে বিচারের ভার গ্রহণ করা আমার পক্ষে বেশ কঠিন কাজ। তবু চেষ্টা করেছি বইয়ের ভূমিকায় লেখিকার দেয়া দায়িত্বভার গ্রহণ করতে। সেটা জানাচ্ছি পাঠপ্রতিক্রিয়া অংশে। তার পূর্বে লেখিকার আলো ফেলা অন্ধকারের গল্পগুলো নিয়ে অল্প করে কিছু বলে নিই।

ফাঙ্গাস- বাস ড্রাইভার ইদ্রিস মিঞা গাড়ির তদারকির ভার তার হেল্পার বজলু মিঞাকে দিয়ে বেশ নিশ্চিত ছিল। এই সুযোগে পরজীবী ফাঙ্গাস জন্ম নেয় বাসের সিটের আনাচে কানাচে। দেখতে সাফ-সুতরো মনে হলেও ফাঙ্গাসের কারণে আদতে সিটগুলো নোংরা। বাসের এক প্যাসেঞ্জার একদিন ঠিকই অভিযোগ তোলে। ইদ্রিস মিঞা মনে মনে রাগান্বিত হয়ে ওঠে বজলুর ওপর। অথচ এটা একটা প্রচ্ছন্ন সতর্কবাণী ছিল। নিজের জিনিসের যত্ন নিজেকেই করতে হয়। অন্যের ওপর ভরসা করলে একদিন ঠিকই ফাঙ্গাস জন্ম নেয়। এই সত্যটা ইদ্রিস মিঞা একসময় আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

তৃতীয় নয়ন- থ্রিলার ঘরানার গল্পটি। ব্যবসায়ী শাহনেওয়াজ কবীর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। যে কোন কারণেই যে কারোরই হৃদরোগে মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু পুলিশ অফিসার সৌরভ খন্দকার আপাত দৃষ্টিতে এই স্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যেও রহস্যের গন্ধ খুঁজে পান। আর এর জের ধরেই খুলে যায় তার তৃতীয় নয়ন। বুঝতে পারেন, শাহনেওয়াজ কবীরের মৃত্যুটা সাদামাটা মনে হলেও আদতে মোটেও তা নয়। এর পেছনে আছে অন্য এক গল্প।

অন্ধকারের ফুল- এক পুলিশ অফিসারের বয়ানে গল্পটি এগিয়েছে। একটি পাহাড়ী মেয়ের হঠাৎ রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। খুনের বিচার না হয়ে ঘটনাটির ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাওয়াটা পুলিশ অফিসারের মনে কৌতুহলের উদ্রেক করে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করার কোন সূত্রও খুঁজে পান না তিনি। হঠাৎ একদিন অতর্কিতভাবেই তার সামনে সব রহস্য দিনের আলোর মতোই প্রকাশিত হয়ে যায়। যে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে সেটাই সকলের অলক্ষ্যে অন্ধকারের ফুল হয়ে ফুটে ওঠে।

জিজ্ঞাসা- মেয়েদের যে সব পুরুষ অহেতুক ‘চাপে রেখে’ পুরুষত্ব ফলায় তাদের জন্য শিক্ষণীয় এই গল্পটি। এটা পড়তে গিয়ে জসীমউদ্দীন এর ‘আটকলা’ গল্পটি মনে পড়ে গেছে। স্বামীকে সোজা করতে ষোলকলার আটকলা দেখিয়েছিল এক‌ পল্লী স্ত্রী। সেই গল্পটি হাস্যরসাত্মক ছিল। পরিণতিও সুন্দর ছিল। কিন্তু ‘জিজ্ঞাসা’ গল্পের পরিণতি ভয়ংকর ও বিষাদময়। গল্পের অন্যান্য চরিত্রের মতো পাঠকের মনেও জন্ম নেয় অনেক জিজ্ঞাসা…যার উত্তর জানতে পেরে চমকে উঠতে হয়।

বন্দি বিষাদ- একটি মনস্তাত্ত্বিক গল্প। সচরাচর জীবনের গল্পগুলোর চেয়ে অনেকখানি ভিন্ন। কখনও কখনও কিছু বিষাদকে একান্ত নিজের কাছে,‌ নিজের মতো করে বন্দি করে রাখতে ইচ্ছে হয়। একজন নারীর অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা বদলে দিতে না পারার কষ্ট, আক্ষেপ ও যন্ত্রণা নিজের মনে পুষে রেখে বিষাদ উদযাপনের গল্প এটি।

অজানা সুরভি- রহস্যময়তার আবরণে মোড়ানো আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক গল্প। থ্রিলারও বলা চলে। গল্প কথক কিশোর ছেলেটি একবার অপহৃত হয়। দীর্ঘদিন বন্দি থাকা অবস্থায় একদিন সে আবিষ্কার করে, সে মানুষের শরীরের গন্ধ বুঝতে পারে। গন্ধ অনুভব করে সে প্রতিটি মানুষকে আলাদা করতে পারে। মানুষভেদে এই অনুভূতি কখনও সুগন্ধি হয়ে ধরা দেয়, কখনও বা আসে অসহ্যকর তীব্র কটু গন্ধ হয়ে। এভাবেই একদিন এই অজানা সুরভি তার সামনে এক অপ্রীতিকর সত্য উন্মোচন করে।

বিবর- প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে জুলেখার চিন্তার শেষ নেই। তাকে ঘরে একা রেখেই কাজে যেতে হয় তাকে। কিন্তু এখন মেয়ের বাড়ন্ত শরীর। চারপাশে শকুনিরা ওৎ পেতে থাকে। এদের হাত থেকে বাঁচাতে বিশ্বস্ত আশ্রয়ে রেখে যায় মেয়েকে। তবু শেষরক্ষা হয় না। কোন এক অজানা বিবরের বিভীষিকায় হারিয়ে যায় জুলেখার শক্ত বিশ্বাসের ভীত।

মেয়েটিকে আমি চিনতাম- চমতকার পরিমিত ভাষায় লেখা একটা ছিমছাম গল্প। ছাপোষা মধ্যবিত্ত এক যুবকের নব্য বড়লোক হয়ে ওঠার গল্প এটি। বড়লোকি পোশাক পড়তে গিয়ে ন্যায়-নীতির পোশাক ছুড়ে ফেলে দেয় সে। মূল চরিত্র গল্পকথক এখানে বেশ রসিয়ে রসিয়ে নিজের বড়লোকি জীবন যাপনের বর্ণনা দেয়। এত সাধের যে বিত্তবানের বেশ তাও খুলে ফেলতে হয় অচিরেই। কেন, সেটা চুপিচুপি বিবেককে বলে যায় ঠিকই, কিন্তু প্রকাশ্যে কোনদিন তার বলা হয়ে উঠে না।

মডেল- ডার্ক কমেডি থ্রিলার। ভাষার নৈপুণ্য চোখে পড়ার মতো। এক মধ্যবয়সী জীবনধর্মী গল্পের লেখক থ্রিলার গল্প লেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। গল্পের কাহিনী খুঁজতে গিয়ে নিজেই আস্ত কড়কড়ে একখানা থ্রিলারের জীবন্ত উপাদান হয়ে পড়েন শেষমেষ। পাঠক গল্পটিতে শুরু থেকেই সাইকো থ্রিলারের গন্ধ পাবেন। শেষটাতে এসে বেশ জোরে একটা ধাক্কা পেতে পারেন।

টেক্কা- ‘টেক্কা’ গল্পটিও থ্রিলার ঘরানার। শেষে এসে এখানেও পাঠক ভীষণভাবে চমৎকৃত হবেন। বোহেমিয়ান আধুনিকতা…উচ্চাভিলাশী কামনা…নাঃ এখানেই থাক! এই গল্পটা পুরোটা বইতে পড়লেই পাঠক পরিপূর্ণ তৃপ্তি পাবেন।

বহ্নিশিখা- আগুনের মতো সুন্দর মুখশ্রী, পরিপাটি পোশাক, স্বল্পভাষী সবমিলিয়ে মেয়েটির ব্যক্তিত্ব অসাধারণ। তার বাসায় নিত্যদিন নানান মানুষের আনাগোনা মনে সন্দেহ জাগায়।
কিন্তু মেয়েটির ব্যক্তিত্বের কারণে তাকে খারাপ ভাবতে মন সায় দেয় না। আবার রহস্যজনক আচরণও তার চরিত্রের পক্ষে কথা বলতে চায় না। শেষমেষ রহস্যই হয়ে থাকে মেয়েটি, বহ্নি যার নাম!

বিবর্ণ সায়র- মানুষের কৃতকর্মের ফল তাকে এক জীবনেই ভোগ করে যেতে হয়। এই কঠিন সত্য দিলারা জামান নিজের চোখে দেখেও উপলব্ধি করতে পারেন না। তার পাপের ফল ভোগ করতে হয় তার মেয়েকেই। দিলারা জামান তবু স্বীকার করেন না, ঈশিতার জীবন সায়রের ঝকঝকে নীল জলে তিনি নিজ হাতে কষ্টের বিবর্ণ রং গুলে দিয়েছেন।

সে… কখনও আসেনি- অসাধারণ ভালোবাসার চিনচিনে ব্যথাময় এক মন কেমন করা গল্প। ভালোবাসা পূর্ণতা পায় প্রকাশে। আর যে ভালোবাসা কখনও প্রকাশিত হয়নি, প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি তাকে কি ভালোবাসা নামে সংজ্ঞায়িত করা যায়? নাকি কখনও তার অস্তিত্ব ছিল না এমন প্রবোধ দিয়ে মনকে স্বান্তনা দিতে হয়? এই গল্পটি এক কিশোরীর প্রথম ভালোবাসার গল্প, জীবনের প্রথম কষ্ট পাওয়ার গল্প। গল্পকথক তার পরিণত বয়সে এসে সে স্মৃতিটাকে মনের খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিয়ে প্রশান্তি খুঁজে নিয়েছেন।

পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ এ বইয়ের বেশিরভাগ গল্প থ্রিলার ধাঁচের হলেও পুরোপুরি থ্রিলার নয়। জীবনধর্মীর পটে আঁকা রহস্যের ছবি যেন গল্পগুলো। মানবজীবনের প্রতিটি ঘটনাই রহস্যে মোড়ানো। যদি সেগুলোকে সেভাবে দেখা হয়। রহস্য মানেই যে গা ছমছমে অনুভূতি, রক্তারক্তি, খুন… এসবই হতে হবে তা নয়। সাদামাটা জীবনের পরতে পরতেও রহস্য লুকিয়ে থাকে, এই চমৎকার ব্যাপারটি প্রকাশ পেয়েছে লেখিকা ফাহমিদা বারীর লেখায়। আমি বলব লেখিকা তার প্রতিটি গল্পের বর্ণনাভঙ্গি, কাহিনী বিন্যাস ও চরিত্রায়নে দারুণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

গল্পগুলো‌ আমাদের সমাজে আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপ্রকাশিত গল্প। গল্পগুলোর প্লট, চরিত্র ও বর্ণনা একটার চেয়ে আরেকটা ভিন্ন। যার কারণে পাঠক হিসেবে আমার কৌতুহল শুধু বেড়েই গেছে। এবং প্রথম গল্প থেকে শেষ গল্প পর্যন্ত সেই কৌতুহল বজায় ছিল। এখানেও লেখিকার লেখনশৈলীর প্রশংসা না করে পারছি না।

তবে হ্যাঁ, গল্পগুলো চমকে যাওয়ার, ধাক্কা খাওয়ার। গল্পগুলো বিষাদের। প্রতিটা গল্প পড়ে কিছু সময়ের জন্য আমি থমকে গেছি। দুঃখ, বিষাদ এসব তো বাস্তব জীবনেরই অংশ। এদের অস্বীকার করার উপায় আছে কি! আনন্দের চিকচিকে রোদ্দুরের জন্য আচমকাই মনটা যেন হাহাকার করে ওঠে। ‘রৌদ্দুর খুঁজে ফিরি’ গল্পগ্রন্থটি তাই কোন ক্লান্তিকর বিকেলে বা একাকী রাতে দুঃখ বিলাসের যথার্থ সঙ্গী হবে বলে মনে করি।

এক নজরে ‘রোদ্দুর খুঁজে ফিরি’
ধরণ: গল্পগ্রন্থ
লেখিকা- ফাহমিদা বারী
প্রকাশনী- চৈতন্য
প্রকাশকাল- অমর একুশে বইমেলা’ ২০২০
পৃষ্ঠাসংখ্যা- ১৭২
মলাট মূল্য- ৩০০ টাকা

মতামত