,

হাকীম ইসমাঈল হিলালী ও চট্টগ্রাম ইউনানী তিব্বিয়া কলেজ

|| হাকীম এস. এম. লুৎফুর রহমান, প্রাক্তন অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম ইউনানী তিব্বিয়া কলেজ ||

কথায় আছে, যে দেশে গুণীর জ্ঞানীর কদর নেই সে দেশে জ্ঞানী গুণী জন্মগ্রহণ করেন না। আজকের আলোচ্য বিষয়ে আমি এমন একজন মহৎপ্রাণ বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী গুণিজনের কথা বলবো, যাঁর মধ্যে বহুবিধ গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর হাতে গড়া স্মৃতিসমূহ আমাদেরকে বার বার তাঁর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিটি হলেন মরহুম হাকীম মাওলানা ইসমাঈল হিলালী।

বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী হাকীম আবু নাঈম মোহাম্মদ ইসমাঈল হিলালী তাঁর শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে পরবর্তীতে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় ও মহৎ গুণাবলীর প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি একাধারে সমাজসেবক, রাজনৈতিক, সুচিকিৎসক, সাহিত্যিক, কবি, দ্বীনি আলেম ও ক্বারী ছিলেন। আরবী, ফার্সি, উর্দু, হাদিস, তফসীর, মনতেক, হিকমত ও এলমে ত্বীর প্রভৃতি শাস্ত্রে অগাধ পন্ডিত্যের জন্য তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বিশেষ পরিচিত ছিলেন। তখন যে কয়েকজন নামকরা উচ্চ শিক্ষিত হাকীম ছিলেন তন্মধ্য ইসমাঈল হিলালীর আসন ছিল প্রথম কাতারে।


আদর্শ গুণাবলী, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও মহৎ চিন্তাধারায় উজ্জীবিত মরহুম ইসমাঈল হিলালী ন্যায় ও আদর্শের জন্যে আজীবন সংগ্রামে ব্রত ছিলেন। তিনি সমাজে শিক্ষা বিস্তারের জন্য জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত করেন। তিনি মনে প্রাণে উপলব্ধি করতেন যে, শিক্ষায় অগ্রগতি ছাড়া ঘুণেধরা এই জীর্ণশীর্ণ জাতির কোনও মুক্তি আসতে পারে না। এ জন্য তরুণ বয়স থেকেই তিনি শিক্ষা বিস্তারের জন্য চিন্তা ভাবনা করতেন।
মরহুম ইসমাঈল হিলালী আলেম সমাজের তথা ইসলামী জ্ঞানে শিক্ষিতদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি বিধানের ব্যাপারে সব সময় চিন্তা করতেন যাতে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা যুবকেরা স্বাধীনভাবে ও সম্মানের সাথে আদর্শ সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগ করতে পারে। তিনি ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞান (এলমে ত্বীর) শিক্ষা লাভ করা আলেম সমাজের জন্য একটি অতিরিক্ত যোগ্যতা বলে মনে করতেন। এসব চিন্তাভাবনার প্রতিফলন হিসেবে তিনি ১৯৫৪ সনে চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থল চন্দনপুরাস্থ বশর বিল্ডিং এ আনছারুতত্বীব কলেজ নামে একটি পরীক্ষামূলক তিব্বিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সরকারী অনুমোদনের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। পরবর্তীতে হাকিম সাহেবের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অদম্য প্রেরণায় চট্টগ্রামে গড়ে উঠে একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনানী আয়ুর্বেদিক তিব্বিয়া কলেজ। তৎকালীন পাকিস্থান ইউনানী ও আযুর্বেদিক বোর্ড (বর্তমানে বাংলাদেশ), কলেজটির স্বীকৃতি ও অনুদান মঞ্জুর করেন। অবশ্য এ কলেজটি বিশেষ বিশেষ সময়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে চালু থাকলেও শেষ পর্যন্ত হাকীম ইসমাঈল হিলালী সাহেবের হাতেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২রা এপ্রিল ১৬৬৯ সনে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনা কমিটিতে হাকীম মরহুম ইসমাইল হিলালী সাহেব প্রতিষ্ঠাতার পাশাপাশি অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হলেন আর পরিচালনা কমিটির সভাপতি হলেন মরহুম আব্দুল মাবুদ খান যার ঐকান্তিক সহযোগিতা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এ কলেজ প্রতিষ্ঠা কাজে তিনি কিছু সংখ্যক উদার ও মহৎ ব্যক্তির একান্ত সাহায্য ও সহানুভূতি লাভ করেন, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসেবে জনসাধারণের কাছে পরিচিত হয়ে উঠে। এসব মহৎ প্রাণ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হাকীম মোবারক আলী হেজাজী, হাকীম নুরুল হক কাসেমী, হাকীম আহমদ ফজল খান, হাকীম রেজওয়ানুল হক, কবিরাজ চিত্তরঞ্জন দাশ শর্মা প্রমুখ।
এ কলেজের সম্প্রসারণ ও সুষ্ট ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে হাকীম সাহেব নিজের কষ্টার্জিত সমস্ত অর্থ-সম্পদ কলেজ ফান্ডে দান করতেন। এছাড়া মরহুমের প্রতিষ্ঠিত ‘‘খঞ্জক দাওয়াখানা’’ থেকে প্রাপ্ত আয়ের সিংহভাগ কলেজের কাজে ব্যয় করতেন। এবং ব্যক্তিগত জমা থেকেই যাবতীয় এস্টাব্লিষ্টমেন্টের পেছনে খরচ করেছিলেন।
আমাদের বিশ্বাস, আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদানে সম্মানিত করবেন।

মতামত