,

মাউন্ট ইউনাম জয় করলেন চট্টগ্রামের সাদাব ইয়াসির

আবু ওবাইদা আরাফাত, নাগরিক নিউজ: একুশ হাজার ফুট উচ্চতায় হিমালয়ের বুকে বাংলাদেশের পতাকাসহ পদচিহ্ন রেখে মাউন্ট ইউনাম জয় করার গৌরব অর্জন করলেন চট্টগ্রামের সন্তান সাদাব ইয়াসির।

তিনি গত ৩১ জুলাই ২০১৯ ইং তারিখে ভার্টিকেল ড্রিমার্স ক্লাবের হয়ে সফলভাবে সামিট সম্পন্ন করেন৷ এসময় তার সাথে ছিলেন উক্ত ক্লাবের অন্যতম সদস্য হাসনাত আল কোরাইশী।

স্বপ্নের সাথে ‘আকাশ ছোঁয়া’ শব্দ যুগলের স্বাচ্ছন্দ্য ব্যবহার বলে দেয় মানুষ স্বভাতই উচ্চতাপ্রেমী। আকাশ ও বরফমাখা পাহাড়ের অনিন্দ্য সুন্দর মিতালিতে দৃষ্টি থির হয়ে থাকেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রকৃতির কোলে বাস করা ভয়ংকর সৌন্দর্য অবগাহন করতে কেউ কেউ পাগলপারা। কারো কাছে জীবন মানে প্রকৃতির সুধা পানের অমিয় সুযোগ! সমূহ প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে তাই স্বপ্ন ছোঁয়ার মিশনে মৃত্যু ঝুঁকিকে জয় করতে পারেন সাদাব ইয়াসিরের মতো কেউ কেউ।

মাউন্ট ইউনাম হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বতগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্টোক কাংড়ির ছয় হাজারী ট্রেকেবল শিখরের মধ্যে পর্বতারোহীদের কাছে ইউনাম পিক বহুল আকাঙ্ক্ষিত এবং অত্যন্ত অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ৷

বিশ হাজার একশত ফুট উচ্চতার ইউনাম জয় করতে তাদের সময় লেগেছে ৩ দিন। শ্বাসরুদ্ধকর ও উত্তেজনাপূর্ণ ইউনাম সামিটের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন ভার্টিকাল ড্রিমার্সের সাধারণ সম্পাদক সাদাব ইয়াসির।

তিনি বলেন- ‘আমরা ২৯ তারিখ সকাল ৮ টায় ভরতপুর পৌঁছাই। ১০.১৫ টা হতে ট্রেকিং শুরু হয়। যেখান হতে শুরু করি সেটি হিমালয়ের জাস্কার রেঞ্জ। শুষ্ক এলাকা। গাছপালা নেই। এখানে অক্সিজেনের স্বল্পতা প্রকট। এর মধ্যেই ২ ঘন্টারও কিছু সময় পরে ৫২০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছে বেস ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিই। বেস ক্যাম্প স্থাপনের পর বিকেল ৩ টা ৩০ মিনিটে আমি একা ওইদিনই সামিটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।’

সামিটের ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন- পূর্বের এক্সপিডিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী স্নো তেমন একটা থাকার কথা না। তাই সাথে স্নো বুট রাখিনি। একহাতে আইস এক্স, অন্য হাত পানির বোতল। পায়ে ট্রেকিং বুট। ৫৪০০ মিটার পৌঁছে নিজের ভুল বুঝতে পারি। কোমর সমান স্নো’র সাথে লড়াই করে ৫৮০০ মিটার পর্যন্ত গিয়েও ওইদিনের মত ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। নিজেকে নিজে বললাম- “পাহাড়, নিজের জায়গায় থাকবে। নিজের ক্ষতি করা চলবে না”।

এত স্নোতে আর বেশিক্ষণ থাকলে ফ্রস্টবাইটে হাত ও পায়ের আঙ্গুল হারাতে হতো! ৫৮০০ মিটার হতে বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে রাত ৯ টার পর এসে পৌঁছাতে পারলাম। হাসনাত বেসক্যাম্পে অপেক্ষা করছিল। স্টোভ জ্বালাতে গিয়েও ব্যার্থ হতে হল। হাত ও পায়ের আঙ্গুলের জন্য ভয় হচ্ছিল, ফ্রস্টবাইট (তুষারক্ষত) যেন না হয়ে যায়। হালকা গরম পানিতে চুবিয়ে রাখা দরকার থাকলেও স্টোভ জ্বালাতে না পেরে পারা গেলোনা। হল না যখন তখন সাহায্য করল হাসনাত। দীর্ঘক্ষণ ধরে পায়ের আঙ্গুল মালিশ করতে থাকল। হাতের আঙ্গুল বগলের নিচে রেখে দিলাম। অবশ্য এসব অভিজ্ঞতা আগে থেকে জানা ছিলো NIM থেকে শেখা পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ হতে।’

পরদিন ৩০ তারিখ সকালে তিনি নিশ্চিত হলেন পুরোপুরি সুস্থ, ঠিক করলেন ৩১ তারিখ দুইজন মিলে সামিট মার্চ করবেন পূর্ণ প্রস্তুতির সাথে।

সামিটের শেষ দিন সম্পর্কে বলেন- ‘৩১ তারিখ ভোর ৪ঃ৩০ এ স্নো বুট, আইস এএক্স সাথে নিয়ে সামিট মার্চ শুরু করলাম ৫২০০ মিটারের বেস ক্যাম্প থেকে কখনও কোমর সমান, কখনও হাঁটু আবার কখনও শক্ত বরফের মত স্নো পার হয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সামিটে পৌঁছাতে সক্ষম হই বিকেল ৪ টার কিছু আগে। এত বেশি সময় লাগার কারণ সফট স্নো। এর মধ্য দিয়েই নিজেদের জন্য রাস্তা তৈরি করে এগিয়ে যেতে হয়েছিল।
পাহাড়ের দুর্ঘটনার বেশিরভাগই হয়েছে নেমে আসার সময়। এমনিতেই ক্লান্ত থাকে শরীর। তার উপর অক্সিজেনের অভাবে উচ্চতাজনিত নানা সমস্যায় ভোগার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। সব ভয় ও বিপদের সম্ভাবনাকে মিথ্যে প্রমাণ করে বেস ক্যাম্পে নেমে আসি অন্ধকারের আগেই। স্নোতে রাস্তা তৈরি করাই ছিল। নামার সময় তেমন অসুবিধাই হয় নি। আমার কিছুক্ষণ পর এসে পৌঁছায় হাসনাতও। পুরো সামিট ছিল আল্পাইন স্টাইলের এক্সপুডিশন ছিল’

আল্পাইন স্টাইল নিয়ে জানতে চাইলে বলেন- ‘ক্লাইম্বার নিজের সকল ক্লাইম্বিং গিয়ার, খাবার, জ্বালানি, স্টোভ, টেন্ট, ব্যক্তিগত সামগ্রী নিজেই বহন করে উপরের দিকে এগিয়ে যাবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সামিট করে ফিরে আসবে। এক্ষেত্রে রুট ওপেনের কাজটি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং টাস্ক। কোন ফিক্সড রোপ থাকবে না।
নিজের জীবনের ঝুঁকি নিজের কাছেই। সাহায্যের জন্য থাকবে না কোন শেরপা। এমন কি সারাদিনের ক্লান্তিকর সামিট মার্চ শেষে নিজের খাবারও নিজেকেই প্রস্তুত করতে হয়েছে।’

পাহাড়ের নেশা কবে থেকে পেয়ে বসলো জানতে চাইলে বলেন- ‘কবে থেকে সেটা ঠিক মনে নেই। ২০১৭ সালে মাউন্ট ফাবরাং এক্সপিডিশন এবং NIM থেকে ২৮ দিনের Basic Mountaineering Course সম্পন্ন করেছি ‘এ’ গ্রেড নিয়ে।’

সাদাব ইয়াসির ২০১৭ ও ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ক্লাবে প্রশিক্ষক হিসেবে রক ক্লাইম্বিং কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৮ সালে দুইবার আল্পাইন স্টাইলে মাউন্ট দিও তিব্বা এক্সপিডিশন করেন। এছাড়া তিনি পর্বতারোহণে আগ্রহী ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণের সুবিধার্থে প্রতি বছর ৪/৫ টি করে ক্লাইম্বিং ওয়ার্কশপ পরিচালনা করে আসছেন দেশের ভিতরেই।
২০১৯ সালে মাউন্ট ইউনাম আল্পাইন স্টাইলে সামিট ছাড়াও আরো একটি হিমালয় শৃঙ্গ জয় করেন।

সাদাব ইয়াসির পর্বতারোহীদের সংগঠন ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের সাধারণ সম্পাদক ও সাইক্লিস্ট সংগঠন দ্বিচক্রযানের সাথেও যুক্ত।

এভারেস্ট নিয়ে তিনি বলেন- ‘এভারেস্ট নিয়ে একদমই স্বপ্ন দেখি না। এভারেস্ট টাকার খেলা। এত টাকা স্পন্সর করার মত আপাতত কাওকে দেখছি না। এছাড়াও শেরপার তৈরি করা ফিক্সড রোপ ও রাস্তায় হেঁটে গিয়ে ক্লাইম্ব করার চেয়ে নিজের ভার নিজে বহন করে, নিজেই রুট ওপেন করে; ক্লাইম্ব না করেও ফিরে আসাটা আমার কাছে গৌরবের।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলেন- ‘আরো দূর্গম পর্বতে আল্পাইন স্টাইলে অভিযান চালাতে চাই’

ব্যক্তিগত জীবনে এডভেঞ্চারপ্রিয় ও ভ্রমণপিয়াসু সাদাব ইয়াসির পড়াশুনা সম্পন্ন করেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ থেকে।

মতামত