,

ব্রেকিং

মুফতি তাকি ওসমানি রচিত হাদিসগ্রন্থের নতুন ভার্সন

বিচারপতি মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী পাকিস্তানের একজন প্রখ্যাত ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনি হাদীস, ইসলামী ফিকহ, তাসাউফ ও অর্থনীতিতে বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি ইসলামী অর্থনীতিতে সক্রিয় ব্যক্তিদের অন্যতম।

১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শরীয়াহ আদালতের এবং ১৯৮২ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের শরীয়াহ আপিল বেঞ্চের বিচারক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

সম্প্রতি মুফতী তাকী উসমানী একটি কিতাব রচনা করেছেন। কিতাবের নাম ‘আল-মুদাওয়াতুল জামিয়াতু লিল আহাদিসিল মারবিয়াতি আনিন নাবিয়্যিল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুরাক্কামাতান বিল আরকামিল আলামিয়াতি’।

বইটি সম্পর্কে লেখক মুফতী তাকী উসমানীর ভূমিকা

‘কিছু ভাই আমাকে হাদীস বিষয়ে নতুন একটি পরামর্শ দিলেন, যেন আন্তর্জাতিকভাবে হাদীসের এমন নম্বর দেয়া হয়, কুরআনিক আয়াত নম্বরের মত, কারণ বর্তমানে হাদীস কোন কিতাব থেকে পৃষ্ঠানুযায়ী বা নম্বরনুযায়ী বের করতে হয়, মুদ্রাজনিত কারণে পৃষ্ঠা, নম্বরদাতাদের ভিন্নমতে নম্বর ভিন্ন হয়েই থাকে। যদি সমস্ত হাদীসে আন্তর্জাতিক কোনো নম্বর ফেলা হয় তাহলে কতইনা ভাল হত!?

এমন ফিকর আমার ভালই লাগল। ভাবলাম, বিশদাকার লিখনি যাতে সমস্ত হাদীস একই সূত্রে গাতা ছাড়া একাজ সম্ভব না, এবং এই নম্বরজাত উপকারজনক করতে হলে কিতাবে একটি হাদীসের সমস্ত সূত্র, কে কোন কিতাবে নকল করেছেন এবং হাদীসটি সহীহ-যয়ীফের ব্যাপারে মুহাদ্দিসীনরা কী বলেছেন তা একত্রিত করতে হবে।

যাতে একজন তালিবে ইলমের জন্য এসব অনায়াসে পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠবে, এজন্য তা হাদীসের সমস্ত কিতাবকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে আমরা হাদীসে নববীর এমন নজিরবিহীন বিশাল খিদমাতাঞ্জাম দিতে পারব যা অতিত হয়নি। ‘

সমকালীন হাদিস বিশারদদের সম্পৃক্ততা

নতুন এ বিষয়বস্তু ও চিন্তার গুরুত্ব পরিমাপ ও বাস্তবায়নযোগ্য করতে সমকালীন বিশ্বের হাদীস বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পবিত্র মক্কায় পরামর্শপূর্বক এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

একলক্ষ্যে ৫ ও ৭ রামজান ১৪২২ হিজরি সনে কাবায় এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়, এতে বহুসংখ্যক এমন উলামায়ে কেরামকে আমন্ত্রণ করা হয় যাদের হাদীস একত্রিত করা, সূচিপত্র তৈরি করা বা হাদীস বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্য রয়েছে।

শায়খ ড.মোস্তাফা আ’জমী রহ.,শায়খ ড. ইউসুফ কারযাবী, মুফতি রফী উসমানী, ড.আবদুল মালেক বিন বকর আবদুল্লাহ কাজী, ড. মাহমুদ তাহহান, ড.আবদুস সাত্তার বিন আবদুল করীম আবু গুদ্দাহ, ড.সাইয়্যিদ মুহাম্মদ সায়্যিদ নুহ, শায়খ নেজাম ইয়াকুবী বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে সকলেই এ মহতি চিন্তার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় দারুল উলূম করাচী’র উপর। কাজের গতি পর্যবেক্ষণ করতে শায়খ ড.মোস্তাফা আ’জমী, মুফতি তাকী উসমানী, ড.আবদুল মালেক বিন বকর আবদুল্লাহ কাজী, ড.আবদুস সাত্তার বিন আবদুল করীম আবু গুদ্দাহকে নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

এ লক্ষ্যে ফের ২৫-২৬ শাওয়াল মক্কায় আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, এতে ড.আবদুল মালেক বিন বকর আবদুল্লাহ কাজী  হাদীস একত্রিতকরণ, সূচিপত্র তৈরি করা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা লিখিত আকারে পেশ করেন এবং কাজের দুটি স্থান নির্ধারণ করেন একটি করাচি অপরটি তার নেগরানিতে কায়রোতে।

বিশাল একাজ সম্পাদনার্থে দারুল উলূম করাচি এ তাখাস্সুস পড়ুয়া ফুযালাদের দিয়ে একটি স্বাতন্ত্র্য বিভাগ খোলা হয়। তাকী উসমানী সাহেব বোনের ছেলে তরুণ আলেমে দীন তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন মাওলানা মুফতি নুআঈম আশরাফকে এর প্রধান করা হয়। তিনি কাজের অগ্রগামীতার জানান দিতে ও পরামর্শপূর্বক শায়খ ড.মোস্তাফা আ’জমী এর কাছেও তাশরীফ নেন।

বইটির  বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. ঐ সমস্ত রেফারেন্সগ্রন্থ যাতে বর্ণিত মারফু হাদীসসমূহ সকলসূত্রে বিদ্যমান এবং এমন হাদীসগ্রন্থের সংখ্যা ৮০।

২. সমস্ত হাদীসগ্রন্থ যা সকলসূত্রে নয় কিন্তু উলামায়ে কেরাম তা থেকে মারফু হাদীসগুলো পৃথক করে নিয়েছেন, এমন কিতাবাদির সংখ্যা ৭১৯।

৩. তাখরীজের কিতাব, যার সংখ্যা ১১১। সবমিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৯১০। এসমস্ত কিতাবের নাম, লেখক, মুদ্রণ পরিচিতি প্রথম খন্ডের শেষাংশে ৭৩১ পৃষ্ঠা থেকে ৮৬৮ পর্যন্ত বিস্তৃতভাবে রয়েছে।

একাজ আঞ্জামে ‘মাকতাবাতুশ শামেলা’ ও ‘জাওয়ামিউল কালিম’র ভরপুর সাহায্য নেওয়া হয়েছে, যদিও সেরেফ এর উপর নির্ভর করা হয়নি, মূল কিতাবের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।

বইয়ের তারতীব

বিভিন্ন জটিলতা থাকায় হুরুফে হেজানুযায়ী তারতীব না দিয়ে বিষয়ভিত্তিক পরিচ্ছেদানুযায়ী হাদীস লিপিবদ্ধ করা হয়। আরবী হরফাকারে না করার কারণসমূহ ভুমিকায় বলা হয়েছে।

হাদীসসমূহকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়

ক.প্রথমে আন্তর্জাতিক নম্বর দিয়ে ‘আর রাকমুল আলমী লিল হাদীস’ শিরনামে একটি হাদীস বিশুদ্ধ গ্রন্থ থেকে পূর্ণ ইবারত নেয়া হয়, এতে কুতুবে সিত্তা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে, এমনি সহীহ বুখারীতে থাকলে তা অগ্রাধিকার পাবে। একে নাম দেওয়া হয়েছে ‘আল হাদীসুল মুখতার’।

খ. যদি একই হাদীস বিভিন্ন সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে বর্ণিত হয় তাহলে ‘আর রাকমুল আলমী লিল হাদীস’র অধীনে ‘আত তরীকুল আজমা’নামে শাখাগত আরেকটি নম্বর দেয়া হয়েছে, যেমন :১/১/, ১/২, ১/৩।

গ. এই হাদীস উল্লিখিত ৯১০কিতাবের যেখানে যেখানে রয়েছে, পৃষ্ঠা খন্ড, শব্দের পার্থক্য, হাদীসের সহীহ-যয়ীফ বিষয়ে মুতাকাদ্দিমীনদের বক্তব্যসহ (যদি থাকে) ‘আত তুরুকুল উখরা’ শিরনামে উল্লেখ করা হয়।

কাজের অগ্রগামীতা

এ পর্যন্ত ৩৪৫২০টি হাদীসে কাজ শেষ হয়, তন্মধ্যে ‘আর রাকমুল আলমী লিল হাদীস’র অধীনে ১৭১৯৪ টি হাদীসে আন্তর্জাতিক নম্বর ফেলা হয়। ‘আত তরীকুল আজমা’ এ শাওয়াহিদের সংখ্যা দাড়ায় ১৭৩২৬টি। উভয়প্রকার মিলে মোটসংখ্যা ৩৩১৯৮৭ টি।

ধারণা করা হয়, এ বিশাল কিতাবটি ৪০ খন্ডে শেষ হবে। নিয়ম হল কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর সবই একত্রে পাবলিশ করা, কিন্তু বিভিন্ন কারণে গত সফর মাসে প্রথম খন্ড পাবলিশ হয়। এতে শুধু কিতাবুল ঈমান রয়েছে, স্থান পেয়েছে আন্তর্জাতিক নম্বরের ৪৪৯ টি হাদীস।

দিতীয় খন্ড শুরু হবে ৪৬১ থেকে। সতর্কতাবশত ১১টি স্থান খালি রাখা হয়, যাতে কিতাবুল ঈমানে কোন হাদীস ছুটে গেলে বা নতুন হাদীস পাওয়া গেলে পরবর্তী সংস্করণে সংযোজন করা যায়।

সর্বপ্রথম ‘নিয়তের হাদীস’ লেখা হয়, এতে এক নম্বর হাদসের অধীনে ‘আত তরীকুল আজমা’এ শাখাগত ৭টি হাদীস রয়েছে, এবং ‘আত তুরুকুল উখরা’ এ মোট ৪৩ টি কিতাব থেকে তাকরীখ করা হয়।

দিতীয় নম্বরে ‘হাদীসে জিবরীল’ স্থান পায়, এর শাখাগত ১১টি নম্বর রয়েছে এবং হাদীসটি আরও ৭০টি হাদীসগ্রন্থ থেকে বের করা হয়।

মোটকথা : যেমনি আমরা কুুরআনের নুসখার ভিন্নতা সত্যেও অনায়াসে বলতে পারি, অমুক সূরার এত নম্বর আয়াত, এমনি এখন বলতে পারব এত নম্বর হাদীস। ‘১ নম্বর হাদীসে আছে’ ১০৫৪৩ নং হাদীস ‘ ২০০০০ নং হাদীস।’

আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে দীনে ইসলাম, ইলম ও উম্মতে মুহাম্মদীর পক্ষ থেকে উত্তম বদলা দান করুন। তাঁদের দীর্ঘজীবি করুন।

মুহাম্মদ উবায়দুল্লাহ আসআদ কাসেমী
আলেম ও শিক্ষক

লেখক : শিক্ষক, জামেয়া কাসেমিয়া দারুল উলূম সাইনবোর্ড, নারায়ণগঞ্জ।

মতামত