,

ব্রেকিং

বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে ককসবাজার!

কক্সবাজারের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ছিল পাহাড় আর ঘন বন। একসময় বন্য হাতিদের অভয়ারণ্য ছিল এটি। কিন্তু এখন কক্সবাজারের দৃশ্যপট একেবারেই পাল্টে গেছে। একসময় যেখানে ছিল সবুজের সমারোহ, যেখানে ছিল পাহাড়, এখন সেসব জায়গাতেই শুধু মানুষ আর মানুষ। আর ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ঘরবাড়ি। বন বা পাহাড়ের ছিটেফোঁটাও আর সেখানে অবশিষ্ট নেই। এই এলাকাগুলো যেন এখন রুক্ষ মরুভূমি। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয় শিবির।

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিতে শুরু করে এই অঞ্চলে। এখন এখানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় দশ লাখ। ৫ হাজার ৮০০ একর জায়গাজুড়ে এখন তাদের বাস। আর তাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বনভূমি। জ্বালানির জোগান দিতে প্রতিনিয়ত কেটে ফেলা হচ্ছে আরও অসংখ্য গাছ। হাতেগোনা কিছু রোহিঙ্গা এনজিও থেকে পাওয়া এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করলেও, শতকরা ৯৫ ভাগ রোহিঙ্গাই জ্বালানির জন্য হয় নিজেরাই বন থেকে গাছ কেটে আনছে, নয়তো স্থানীয় বাজার থেকে কাঠ কিনছে।

পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই কক্সবাজার পরিণত হবে দক্ষিণ এশিয়ার ভয়াবহতম জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়া জেলায়। ২০১৮ সালের জুনে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল এমনই তথ্য।

বাড়াচ্ছে ভূমি ধসের শঙ্কা
নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে বড় ধরনের পাহাড় ধসের আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের পাহাড়গুলো পাথুরে নয়, এগুলোর ভিত্তি হলো নরম মাটি। গাছের শেকড় থেকে এই পাহাড়গুলো স্থায়িত্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু একের পর এক বৃক্ষনিধন ও বনভূমি উজাড় করে দেওয়ার ফলে ক্রমশই অস্থিতিশীল হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের ভিত্তি এবং তৈরি হচ্ছে পাহাড় ধসের সম্ভাবনা। প্রবল বর্ষণে স্বাভাবিকভাবেই নরম মাটি পাহাড় ধসের সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আর যেহেতু কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা, তাই প্রতিবছরই এখানে মাঝারি থেকে বড় আকারের ঘূর্ণিঝড় দেখা যায়। তখন পাহাড় ধসের প্রবণতা আরও বাড়ে।

কমছে সুপেয় পানি
রোহিঙ্গারা এ দেশে আসার পর থেকে প্রথম কয়েক মাস শ্যালো টিউবওয়েলের মাধ্যমেই পানির চাহিদা মেটাতো। ১৫০ ফুট পর্যন্ত গভীরতা থেকেই পানি উত্তোলন করতে পারত তারা। কিন্তু পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ফলে ইতোমধ্যেই শুকিয়ে গেছে অধিকাংশ শ্যালো টিউবওয়েল। ফলে আগামীতে সেখানে সুপেয় পানির বড় সংকট দেখা যাবে।

বাড়ছে গর্ভপাত
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি গর্ভপাতের কোনো যোগাযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু গবেষকরা দেখেছেন, বাংলাদেশের যেসব এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের হার বেশি, সেসব জায়গায় গর্ভবতী নারীদের সন্তান নষ্ট হওয়ার হারও বেশি। বিশেষত সম্প্রতি অতীতে দেশের পূর্বাঞ্চল ও সমুদ্র-উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে গর্ভপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ধারণা করা যাচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

বর্তমানে বিদেশি সাহায্য ও নিজস্ব অর্থায়নে রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণ করা সম্ভব হলেও তারা যদি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে থেকে যায়, তবে এ দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের হার আরও ত্বরান্বিত হবে। আগামী কয়েক বছরে তা ভয়াবহ সংকটে রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিসত্বর কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গারা যেন নির্বিচারে কক্সবাজারের বৃক্ষনিধন করতে না পারে সেদিকে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা মেটানোর কার্যকরী বিকল্পের ব্যবস্থা করতে হবে। যত দিন পর্যন্ত না তা সম্ভব হয় তত দিন সব রোহিঙ্গার কাছে এলপিজি পৌঁছে দিতে হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশকর্মী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের চাপে কক্সবাজারের পরিবেশ বিপর্যয়টা ঘটছে মারাত্মক পর্যায়ে। ওরা পাহাড়গুলো উজাড় করে ন্যাড়া করে ফেলেছে। অনেক সংকট তৈরি করেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে যে ক্ষতিটা হয়েছে, আমাদের স্থলসীমার ওপর, আমাদের বনভূমির ওপর, আমাদের পাহাড়ের ওপর, এটা থেকে উত্তরণের সহজ কোনো উপায় নেই। তবে ক্ষতিটাকে আটকে দেওয়ার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। উজাড় হয়ে যাওয়া পাহাড়গুলোতে বনায়ন করা উচিত। খোলাকাগজ

মতামত