বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল আরো তিন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তাঁকে। এরমধ্যে আছে কুমিল্লায় নাশকতার একটি মামলা এবং ঢাকার তেজগাঁও ও শাহবাগ থানার আরও দুটি মামলা। শাহবাগ থানার মামলায় ১৮ ফেব্রুয়ারি এবং তেজগাঁও থানার মামলায় ৪ মার্চ খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে বলে জানা গেছে। আর তা হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জামিনে বের হওয়া দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যে মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাবন্দী হয়েছেন খালেদা জিয়া সেই জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট দুর্নীতি মামলার সার্টিফায়েড কপি এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে এ মামলায় আপিল করে জামিন করতেও বেশ সময় লাগবে। তার ওপর নতুন করে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো শুরু হওয়ায় তার মুক্তি নিয়ে শঙ্কা আরো বেড়েই যাচ্ছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি আটকাতে এসব ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। রায় হওয়া মামলা ছাড়া নাশকতা ও দুর্নীতি মিলিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন আরো ৩৪টি মামলার আসামি। তার মধ্যে ১৯টি মামলা বিচারাধীন। এগিয়ে আছে জিয়া চ্যারিটেবল দুর্নীতি মামলা। এ মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ১২টি মামলা রয়েছে তদন্তাধীন। হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে ৩টি মামলা। তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩৫টি মামলার ৫টি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের। আর অন্য ৩০টি বর্তমান সরকার আমলের। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গতকাল গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আদালতের জারি করা প্রোডাক্টশন ওয়ারেন্ট(পিডব্লিউ) গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় কারাগারে এসে পৌঁছেছে। কারা অধিদফতরের মহাপরিদর্শক (প্রিজন)ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ ইফতেখার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন,সন্ধ্যায় খালেদার বিরুদ্ধে আদালতের প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট কারাগারে এসে পৌঁছেছে। তাঁর বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দেয়। একটি মামলায় অর্থাৎ বাসে নাশকতায় ৮জন নিহতের ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলটির সাতজন শীর্ষ নেতাকে হুকুমের আসামি করা হয়। পরবর্তীতে মামলার চার্জশিটে ৬৮জনকে অভিযুক্ত করেছে পুলিশ। নাশকতার এসব মামলায় গতবছরের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন কুমিল্লার একটি আদালত। সংশিহ্মষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসনসহ অন্য আসামিরা জামিন নিয়েছেন। তবে খালেদা জিয়া জামিন নেননি। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বলবৎ রয়েছে। ফলে ওই মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অন্যদিকে, শাহবাগ ও তেজগাঁও থানার অন্য দুই মামলায়ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছেন আইজি প্রিজন ।

এদিকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি দীর্ঘায়িত করতে সরকার ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করতে রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি এখনও না পাওয়ার পেছনেও সরকারের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদের। তিনি বলেছেন,বৃহস্পতিবার আমরা মামলার রায়ের কপি চেয়েছিলাম,সেদিন আমরা সত্যায়িত কপিটি পাইনি। গতকালও দেয়া হয়নি বলে শুনেছি। এভাবে তারা (সরকার) রায়ের কপি দেওয়া নিয়ে গড়িমসি করে যাচ্ছে, করছে। ৬ শতাধিক পৃষ্ঠার এই রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পেলে হাই কোর্টে আপিল করে তার জামিন চাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আছেন আইনজীবীরা। ঢাকায় এক আলোচনা সভায় গড়িমসির অভিযোগ তুলে মওদুদ বলেন,একেকটা দিন দেরি করলে বেগম জিয়া আরও একদিনের জন্য কষ্ট পাবেন, এটাই তাদের মনের ইচ্ছা বলে মনে হয়। এত নিষ্ঠুর! জেলখানাতে যদি মানবিক আচরণ না করেন– তাহলে এই সরকারকে কী বলব?এই সরকার একটা অমানবিক সরকার, মানবতা বোধ নেই তাদের।

মওদুদ বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, বেগম খালেদা জিয়াকে যতই কষ্ট দেবেন, আপনাদের ভোট ততই কমতে থাকবে। প্রতিদিন বেগম জিয়া জেলে থাকবেন,প্রতিদিন আপনাদের ১০ ল ভোটারের ভোট কমে যাবে। আওয়ামী লীগকে কে বুদ্ধি দিল বেগম জিয়াকে জেলখানায় পাঠাতে হবে, পাঠালে বোধহয় বিএনপি একেবারে শেষ হয়ে যাবে। এটা ঠিক না। বিএনপি যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন সবচাইতে শক্তিশালী ও সবচাইতে ঐক্যবদ্ধ।’

দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, খালেদা জিয়াকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে তাঁর মুক্তি দীর্ঘায়িত করতে। গতকাল বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,বর্তমান সরকার চায় খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হোক। তাই জামিনে থাকা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এটির মাধ্যমে পরিষ্কার হয় যে সরকার বিএনপির চেয়ারপারসনের জামিন বিলম্বিত করতে চায়। আর সেই জন্য তারা নতুন ষড়যন্ত্র করছে।

সরকার নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতেই খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন রিজভী। তিনি বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় রায়ের পেছনে সরকারের অন্যায় ইঙ্গিত রয়েছে। আওয়ামী লীগ চায় আবারও ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা ভোট করে ক্ষমতা ধরে রাখতে। বিএনপি খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার আন্দোলন থেকে সরে আসবে না এবং তাকে মুক্ত করেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন রুহুল কবির রিজভী। এ ছাড়া সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। রিজভী বলেন, সরকার বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর তাই রাজনৈতিক দলগুলোর সভাসমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচির কথা শুনলেই তাই ভীত হয়ে উঠে।সরকারের পতনের সময় ঘনিয়ে এসেছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘আর তাই পতনের আগে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের বিরোধী দলের ওপর মরণ কামড় দিচ্ছে। শেষ চেষ্টা করছে নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা ধরে রাখতে।’ বিএনপির চেয়ারপারসনের মুক্তির আন্দোলন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রোববার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ৮৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান রিজভী। এ ছাড়া গেল ৩০ জানুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান তিনি।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রায়ের সার্টিফায়েড কপি হাতে পেলেই আপিল করবো। কিন্তু অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলে সেসব মামলায়ও জামিন নিতে হবে। অন্যথায় তাকে মুক্ত করা যাবে না। তবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে কতদিন সময় লাগতে পারে এ বিষয়ে তিনি কিছুই বলতে পারছেন না।

গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা : খালেদা, তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও থানায় গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা দায়ের করেন দুদকের উপ পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী। এই মামলা দায়েরের পরদিনই খালেদাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরের বছর ১৩ মে খালেদাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। ঢাকার তিন নম্বরর বিশেষ জজ আবু সৈয়দ দিলজার হোসেনের আদালতে মামলাটির অভিযোগ গঠনের শুনানি চলছে। গত ২১ জানুয়ারি বিচারক আগামী ৪ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করে দিয়েছিলেন।

কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা : বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলাটিরও অভিযোগ গঠনের শুনানি চলছে ঢাকার ২ নম্বর বিশেষ জজ হোসনে আরা বেগমের আদালতে। এটির শুনানির পরবর্তী তারিখ জানা যায়নি। এই মামলাটি দুদক দায়ের করে ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি খালেদা এবং তার মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে। ওই বছরের ৫ অক্টোবর ১৬ জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয় আদালতে।

নাইকো দুর্নীতি মামলা : নাইকো মামলাটি হয়েছিল ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায়। দুদক মামলার পর তদন্ত করে ২০০৮ সালের ৫ মে খালেদাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছিল। বর্তমানে মামলাটিতে ঢাকার নয় নম্বর বিশেষ জজ মাহমুদুল কবীরের আদালতে আসামিদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদনের শুনানি চলছে। ১১ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক রয়েছে।

সূত্র: আজাদী

%d bloggers like this: